বাংলাদেশের আচরণ ‘থার্ড ক্লাস’! বললেন ক্রুদ্ধ জয়সুরিয়া

43

আজ ভারতের বিরুদ্ধে ফাইনাল খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কায় টি-টোয়েন্টি নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল ম্যাচ মাঠে গড়ানোর আগে বাংলাদেশের মনোবল ভেঙে দিতে অনেক ধরনের চেষ্টা চলছে। সবাই অবশ্য খেলার জগতে বিপক্ষকে হারাতে নানান কৌশলের অংশ হিসেবেই ধরে নেন এসব ‘কূটচাল’।

সেই কূটচালে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের নানাভাবে অপবাদে ধরাশায়ী করতে চাইছে সাবেক ভারতীয় কাপ্তান সুনীল গাভাস্কারসহ দেশটির অনেক পক্ষ- এটাও হয়তো একার্থে সহনীয়। সঙ্গে আছে ভারতীয় মিডিয়াও। ঠিক আছে মানলাম। কিন্তু শ্রীলঙ্কার কেউ- তাও যদি জয়সুরিয়ার মতো শানদার ক্রিকেটার ওই দলে যোগ দেন- বিষয়টি অদ্ভুতই ঠেকে। কারণ, ফাইনাল একদম নাকের ডগায়।

গত শুক্রবার ত্রিদেশীয় নিদাহাস ট্রফির লিগ পর্যায়ের শেষ ম্যাচে আম্পায়ারের অসাধু আচরণের বিরুদ্ধে টিম বাংলাদেশ যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তা সহজভাবে নিতে পারছেন না বাংলাদেশের ভালো দেখে অখুশি হওয়া পক্ষগুলো। এই দলে এবার মাথা গলালেন সাবেক শ্রীলঙ্কান কাপ্তান, অল-রাউন্ডার ও হার্ড হিটার ব্যাটসম্যান দেশবন্ধু সনথ তেরান জয়সুরিয়া ওরফে সনথ জয়সুরিয়া।

খেলার শেষ তিন বলের দুই বলেই জয়ের জন্য দরকার ১০ রান নিয়ে শ্রীলঙ্কাকে নিজের দেশেই আয়োজিত টুর্নামেন্ট থেকে অনেকটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়াটা মোটেই হজম করতে পারছেন না তিনি। তাই তার টুইটে উঠে এসেছে- বাংলাদেশকে হেয় করা মন্তব্য! কিন্তু লেগ আম্পায়ার ‘নো বল’ ডাকার পরও কেন তা মানা হলো না- এ প্রসঙ্গে যেন ‘কবি নীরব’! এ নিয়ে তার কোনো বয়ান-বিশ্লেষণ চোখে পড়ছে না।

প্রসঙ্গত, নিজদেশের নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল খেলতে শ্রীলঙ্কা এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে তারা ফাইনালের টিকিটও সময়ের অনেক আগেই ছাপিয়ে ফেলেছিল যাতে লেখা রয়েছে শ্রীলঙ্কা-ভারত ফাইনাল। তার মানে ‘ডালমে কুচ কালা’ না বলে বলা উচিত- সম্পূর্ণ ডালই পোকায় খাওয়া এবং ‘কালা’ ছিল। কিন্তু লঙ্কান স্বপ্নের সৌধ একেবারে তচনচ করে দেন মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদ তার শেষ একটি চার আর একটি ছক্কায়।

এতেই ‘খামোখা খেপে যাওয়াদের’ দলে যোগ দিলেন জয়সুরিয়া। মাইক্রোব্লগিং সাইট ট্যুইটারে জয়সুরিয়া বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের প্রতিবাদী আচরণের বিরোধিতা করেছেন, তিনি তাদের আচরণকে আখ্যা দিয়েছেন ‘তৃতীয় শ্রেণির’ হিসেবে।

নবভারতটাইমস.কম-এ ছাপা হওয়া জয়সুরিয়ার আলোচিত ট্যুইটের স্ক্রিনশট

দুজন স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করা ও তালাকপ্রাপ্ত (দ্বিতীয় স্ত্রী সান্ড্রার সঙ্গে ২০১২ সালে ডিভোর্স হয়) জয়সুরিয়া অবশ্য নিজের ফেলে দেওয়া থুতু চেটে নেওয়ার মতো পরে সেই আপত্তিকর ট্যুইট মুছে দিয়েছেন।

মুছে ফেলা ওই ট্যুইটে জয়সুরিয়া কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে কাচভাঙা ড্রেসিংরুমের ছবিও দিয়েছেন। অসাধারণ জয়ের পর বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের আনন্দ-উদযাপনকালে ড্রেসিংরুমের দরোজার একটি কাচ অসাবধানতায় খুলে পড়ে ভেঙে যায় বলে জানা গেছে পরবর্তী তদন্তে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি একজন ক্রিকেটার এতে নিজের দায়ও স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

অপরদিকে, জয়সুরিয়া লিখেছেন- শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলা ম্যাচের উত্তেজনাকর পরিণতির পর বাংলাদেশি টিমের আনন্দ উদযাপনকালে ড্রেসিং রুমের কাচের দরজা চুরমার করে দেওয়া হয়। তৃতীয় শ্রেণির আচরণ।

এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভারতীয় হিন্দি পত্রিকা নবভারতটাইমস.কম জানায়, সিসিটিভি ফুটেজের ওপর নির্ভর করে ঘটনার পুরো তদন্ত এখনো বাকি আছে তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ক্ষতিপূরণের বিষয়ে ইতিমধ্যে কথা বলেছে।

ক্রিকেটবিশ্বে জয়সুরিয়ার কৃতীত্বের তুলনা অনেক ক্ষেত্রেই মেলা ভার। তিনি একমাত্র ক্রিকেটার ওয়ানডেতে যার পরপর দুই ম্যাচে আছে ১৫০+ রানের ইনিংস। এ ছাড়া একদিনের ক্রিকেটে তার রয়েছে চারটি দেড় শতাধিক রান যেখানে তার একমাত্র সঙ্গী শচীন টেন্ডুলকার। দ্রুততম ওয়ানডে ১৫০ রানের রেকর্ডও (৯৫ বলে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে) তার। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তার ১৭ বলে করা দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ড বজায় ছিল টানা ১৯ বছর। এবি ডি ভিলিয়ার্স সেই রেকর্ড ভাঙলেও জয়সুরিয়ার অর্ধশতকটিকেই সেরা বলে ধরা হয় কারণ জয়সুরিয়ার ওই ফিফটির সময়ে ছিল না ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন বা পাওয়ার প্লের নিয়ম। বিষয়টা কঠিনই ছিল।

শ্রীলঙ্কান জাতীয় দলের চিফ সিলেক্টর জয়সুরিয়ার সময়ে তার দেশ টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বর স্থান হারায়। হারতে থাকে একের পর এক সিরিজ। এর মধ্যে আছে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো নিজদেশের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ হেরে বসে জিম্বাবুয়ের কাছে। এরপর বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে সবগুলো ফর্মেটেই সিরিজ ড্র করে আসে। জয়সুরিয়ার অধীন শ্রীলঙ্কান দলের আরো হতাশাজনক পারফর্মেন্সের ঘটনা আছে। ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট থেকে আগেভাগেই বিদায় নেয় শ্রীলঙ্কা। ২০১৭ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও একই অবস্থা হয় জয়াসুরিয়ার নির্বাচিত ক্রিকেট দলের।

এসব কারণেই কি ‘অকারণে’ বাংলাদেশের ওপর খেপে আছেন জয়সুরিয়া? কারণ, কেউ কেউ অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় করার চেষ্টা করেন।

তবে তার অধীনে লঙ্কান টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে এবং টেস্ট দলে বেশ কিছু খেলোয়াড় অভিষিক্ত হন, মাথায় পরেন জাতীয় দলের সম্মানের ক্যাপ। আর দলে বারবার শাফলিংও হয় তার সময়ে।

প্রসঙ্গত , জয়সুরিয়া শ্রীলঙ্কায় বিশেষ করে তার নিজের এলাকায় মাতারায় ব্যাপক জনপ্রিয়। ২০১০ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে সেখানে সর্বোচ্চ ভোট পান। তিনি মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকারে পোস্টাল সার্ভিসের ডেপুটি মিনিস্টার হন। পরেরবার মাইথ্রিপালা সিরিসেনার সরকারে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি মিনিস্টার হন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে তিনি অংশ না নিলেও প্রচারণায় অংশ নেন এবং তার দল জয়ী হয়।

২০১৮ সালের জানুয়ারির খবরে জানা যায়, হাঁটুর মারাত্মক ইনজুরি নিয়ে এখন লড়ছেন জয়সুরিয়া। তিনি অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে তার হাঁটুর চিকিৎসা চলে মাসব্যাপী। আমরা আশা করছি তার দ্রুত রোগ মুক্তি- শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক।