যৌনচাহিদা মেটাতে সহজেই মিলছে রোহিঙ্গা মেয়ে

113

ডেস্ক রিপোর্ট :

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মেয়ে শিশুদের নিয়ে অনুসন্ধান চালায় বিবিসি । সেখানে বলা হয়, এই শরণার্থীশিবিরের কিশোরিদের যৌনকর্মী বানানো হচ্ছে । বিশেষ করে বিদেশিরা যৌনচাহিদা মেটাতে সহজেই রোহিঙ্গা মেয়েদের পাচ্ছে । এ অবস্থা তাদের জন্যে নতুন বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে জানায় বিবিসি ।

আনোয়ারার বয়স ১৪। মিয়ানমারে পরিবার হারানো পর বাংলাদেশে পাড়ি দেয় সে। ‘একটা ভ্যানে করে মেয়েরা যাচ্ছিল, আমাকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে’, জানায় মেয়েটি। পরে একদল মেয়ের সঙ্গে তাকে একটি গাড়িতে উঠতে হয় । বলা হয়, তাদের নিরাপদে নতুন জীবন দেওয়া হবে । পরিবর্তে কক্সবাজার আনা হয়েছে ।

‘এখানে আসার পর বেশি সময় গড়ায়নি দুজন পুরুষ আসে আমার কাছে । চাকু বের করে আমার পেটে ঘুষি মারে । তারপর তারা আমাকে ধর্ষণ করে । আমি বাধা দিচ্ছিলাম, কিন্তু তারা থামেনি’, জানায় আনোয়ারার ।

এখন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নারী-শিশুরা যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহারের টার্গেট হয়েছে । বিভিন্ন প্রলোভনেও তাদের এ পথে নামানো হচ্ছে ।

বেশ কিছু সময় ধরেই এমন অভিযোগের খবর পাচ্ছিল অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন সেন্টিনেল’। তারা স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে জোট বেঁধে অনুসন্ধান শুরু করে । তাদের দলে যোগ দেয় বিবিসি’র অনুসন্ধানী দল । এসব নারী-শিশুদের ঢাকার বাসা-বাড়িতে এবং হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজের ভালো বেতনে কাজের প্রলোভন দেখানো হয়।

এই শরণার্থীশিবিরের এলোমেলো নিদারুণ অবস্থা শিশুদের পতিতাবৃত্তিতে আনার পথটাকে সহজ করেছে। মিয়ানমার থেকে দুঃস্বপ্নের সময় থেকে পালিয়ে এসে তারা আরেক নিষ্ঠুর বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে।

একইভাবে পতিতাবৃত্তিতে নামানো হয়েছিল ১৪ বছরের মাসুদাকে। স্থানীয় এক চ্যারিটি তাকে উদ্ধার করেছে। সে জানায় তার আরেক অভিজ্ঞতার কথা।

সে জানায়, ‘এক নারী আমাকে চাকরির লোভ দেখায়। কিন্তু ওই নারী নিজেই পতিতা তা সবাই জানতো। আমিও বুঝেছিলাম ভাগ্য কী ঘটতে চলেছে। ওই মহিলা রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে এখানে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন। কিন্তু বিষয়টা আমি চিন্তা করলাম। কারণ, এখানে আমার জন্যে আর কিছু নেই। আমার পরিবার হারিয়ে গেছে। আমার কাছে কোনো অর্থ নেই। মিয়ানমারে আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তখন আমি বনের মধ্যে ভাই-বোনকে নিয়ে খেলছিলাম’।

অবশ্য এই ক্যাম্পের অনেকেই তাদের জীবনটাকে ভালো চোখেই দেখছেন। কারণ, তাদের কাছে বাইরের দুনিয়ার যেকোনো স্থানের চেয়ে এই ক্যাম্প অনেক ভালো। অন্তত সেখানে নৃশংস মৃত্যুর ভয় নেই।

বিবিসি’র দলটি ‘যৌনদাসীর খোঁজে আসা বিদেশি’র বেশে ক্যাম্পে অনুসন্ধান চালাতে থাকে। সেখানে তারা স্থানীয় দালালদের নম্বর পান এবং সেখানে আলাদা কক্ষেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পুলিশকে জানিয়েই বিবিসি’র দলটি তাদের কৌশলে এগোচ্ছিলেন। তারা এক দালালের কাছে রোহিঙ্গা শিশুর খোঁজ চায়। জবাব আসে, ‘আমাদের কাছে অনেক কম বয়সী মেয়ে আছে। কিন্তু রোহিঙ্গা মেয়েই কেন? তারা তো সবচেয়ে নোংরা’।

অনুসন্ধানে রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের পতিতা হিসেবে পাওয়ার উপায় হিসেবে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। এখানে রোহিঙ্গাদের খুব সহজেই এবং সবচেয়ে কম খরচে পাওয়া যায়। এভাবে বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে অনেক রোহিঙ্গা মেয়েদের পতিতা হিসেবে পাওয়ার প্রস্তাব আসে তাদের কাছে। এমনকি ১৩-১৭ বছরের মেয়েদের ছবিও আসতে থাকে তাদের কাছে। যত বেশি মেয়েদের খবর আসতে থাকে, দালালদের নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি সম্পর্কে ততটাই ধারণা মেলে সাংবাদিকদের।

এসব মেয়েদের মধ্যে অনেকেই আবার দালালের পরিবারেই সদস্য। তাদের খদ্দের না মিললে রান্না বা ঘর সামলানোর কাজই করতে হয়।

অনেকেই সাংবাদিকদের জানান, এসব মেয়েদের দীর্ঘ সময় ধরে এ পথে রাখা হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের মানুষরাই খদ্দের হিসেবে আসে। তবে কম বয়সীদের এ কাজে ইচ্ছেমতো রাখা যায় না। তারা হইচই করে।

বিবিসি অনুসন্ধানকালে গোপন ভিডিও-তে অনেক কিছুই ধারণ করে। এসব তথ্য-প্রমাণ হিসেবে স্থানীয় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ছোট আকারের একটি দল তাদের অপারেশন শুরু করে।

একজন দালালকে ধরার পরই তাকে পুলিশ কর্মকর্তারা চিনতে পারেন। বলেন, ‘আমরা তাকে খুব ভালো করেই চিনি’। সম্ভবত সে পরিচিতি কোনো অপরাধী। তবে এ কথায় আর কী কী বোঝা যায় তা পরিষ্কার হয়নি সাংবাদিকদের কাছে।

এ দালালকে ধরা হয় ফাঁদ পেতে। তাদে দুজন রোহিঙ্গা মেয়ের ছবি দেখিয়ে আনতে বলা হয় কক্সবাজারের একটি অভিজাত হোটেলে। নিচে গোপনে অবস্থান নেয় পুলিশ। খদ্দেরের বেশে এক দোভাষি নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন সাংবাদিক। সময়মতো ফোন আসে দালালের। তিনি ‘খদ্দের’কে হোটেল থেকে বাইরে এসে মেয়ে দুটোকে নিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু এতে রাজি হন না সাংবাদিক। তিনি মেয়ে দুটোকে তার কাছে নিয়ে আসতে বলেন। কিন্তু দালাল আরো বেশি চালাক। তিনি এক গাড়িচালককে পাঠান মেয়ে দুটোকে পৌঁছে দিতে।

সেখানে টাকার লেনদেন হয়। ছদ্মবেশি খদ্দের জিজ্ঞাসা করেন, যদি আরো মেয়ের প্রয়োজন হয় তবে দেওয়া যাবে? ‘হ্যাঁ’-সূচক মাথা নাড়েন গাড়িচালক।

টাকা বিনিময়ের পর পরই তাকে আটক করে পুলিশ। মেয়ে দুটোর দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় চাইল্ডকেয়ার প্রফেশনালদের। এই মেয়ে দুটোর জীবন দারিদ্রতা আর পতিতাবৃত্তির মাঝে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তারা জানায়, এ কাজ ছাড়া তারা কোনভাবেই অর্থ পায় না। পরিবারকে খাওয়ানোর জন্যেই এমনটা করছে তারা।

আসলে হাজার হাজার নারী-শিশু যখন দেশ পালিয়ে অন্যদেশে যায়, তখন সেখানে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সোশাল মিডিয়া এবং প্রযুক্তির কারণে অপরাধীরা খুব সহজে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে।

এমন অসংখ্যা রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের দুর্ভাগ্য দেখেছি চিটাগাং ও ঢাকায়, নেপালের কাঠমুন্ডুতে আর ভারতের কলকাতায়। বিশেষ করে কলকাতায় পতিতাবৃত্তি এতটাই বেড়েছে যে তাদের ভারতীয় নাগরিকের কাগজপত্র দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভারতীয় পতিতা হিসেবে তারা এ জীবনে ঢুকে পড়ছে স্থায়ীভাবে। তাদের আসল পরিচয় আর থাকছে না।

ঢাকার একটি সাইবার ক্রাইম ইউনিট কথা বলেছে বিবিসি’র সাংবাদিকদের সঙ্গে। ইউনিটটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে কীভাবে পতিতাবৃত্তি চালানো হচ্ছে তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরে। ফেসবুকের বিভিন্ন ‘ওপেন’ এবং ‘ক্লোজড’ গ্রুপের মাধ্যমে শিশুদের সেক্স ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকানো হচ্ছে। এমনকি ইন্টারনেটে এক অভিজ্ঞ ব্যক্তি কীভাবে শিশুদের (বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিশুদের) কব্জা করতে হয়, কীভাবে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখে ধুলা দিতে হয় এবং নিজের শিকার হাসিল করতে হয় সে পদ্ধতি শেখানোর প্রস্তাব করেছে।

বাংলাদেশে এভানে অফলাইন বা অনলাইনে অপরাধীচক্রের ব্যাপক কার্যক্রম চলছে। আর নিয়মিতভাবে এসব পাচারকারী, দালাল এবং মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা পতিতাবৃত্তিতে নারী ও শিশুদের নিয়োগ করতে বাধ্য করছে। তাদের শিকার বাছাইয়ের একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প।

বিবিসি