কলকাতার মরা পশুর পচা-গলা মাংস বাংলাদেশেও আসত !

47

কলকাতা ও আশপাশের ভাগাড় থেকে সংগৃহীত মরা পশুর মাংস শুধু সেখানকার শহরতলির রেস্তোরাঁ, হোটেল বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেই নয়, সীমান্ত পেরিয়ে তা পৌঁছে যেত বাংলাদেশ, নেপালেও । এই চক্রের মূল হোতা সানি মালিককে জেরা করেই উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। বৃহস্পতিবারই সানিসহ ছয় অভিযুক্তকে আটক করা হয়।এরপর রাতভর অভিযুক্তদের জেরা করা হয় । তাতেই মরা পশুর মাংসের ব্যবসার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্রের যোগের বিষয়টি জানতে পারে পুলিশ ।

মরা পশুর মাংস রাসায়নিক সমেত হিমঘরে রাখার পর সেই মাংস প্যাকেটজাত করে বাজারের তুলনায় অনেক কম দামে বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হতো । কিন্তু প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেটজাত করার ফলে বিদেশের আমদানীকারকদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে এই মাংস মরা পশুর । পুলিশি জেরায় অভিযুক্তরা কার্যত পুরো ঘটনাটিই স্বীকার করে নিয়েছে ।

প্যাকেটবন্দী ভাগাড়ের পচা মাংসই পৌঁছে যাচ্ছে কলকাতা ও শহরতলির হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলিতে । রাসায়নিকের ব্যবহারে আরও সুস্বাদু সেই মাংস দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে বিরিয়ানি বা রোল । তুলনায় অনেক সস্তায় মিলছে সেই রোল। ভাগাড়ের মাংসের সবচেয়ে বড় মার্কেট ফ্রোজেন মিট। যে কোন ডিপার্টমেন্ট স্টোরে দেদার বিকোয় প্যাকেটজাত মিট বল বা সসেজ। নামী দামী সংস্থার মিট বল বা সসেজের নকল মোড়কে ঢুকছে ভাগাড়ের মাংস। সাধারণ মিট বল বা সসেজের চেয়ে বিশ শতাংশ কমে মিলছে ভাগাড়ের মাংসের এই পণ্য। পুলিশের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ছাড়িয়ে বাংলাদেশ বা নেপালের মতো দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে পচা-গলা মাংসের বিশাল ব্যবসা।

কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন ভাগাড়ের দায়িত্বে থাকে একজন তথ্য প্রদানকারী। ভাগাড়ে পশুর লাশ পড়লেই সক্রিয় হয়ে যেত চক্রের সদস্যরা। খবর পৌঁছে যেতো প্রধান জায়গায়। ভাগাড়ের কাছে হাজির হয়ে যেতো গাড়ি। গাড়ির মধ্যেই থাকতো রেফ্রিজারেটর। হিমঘরে লাশ পৌঁছোনোর পর শুরু হয় প্রক্রিয়াকরণ পর্ব। প্রথমে পশুর লাশ থেকে মাংস ও চর্বিকে আলাদা করে ফেলা হয়। চর্বি ছাড়ার বাকী মাংসে মেশানো হয় সাদা রঙের রাসায়নিক। লাশ সংরক্ষণের জন্য ইঞ্জেকশনও ব্যবহার করা হয়। পরে রাসায়নিক মেশানো পচা মাংসকে ৪-৫ দিন ধরে মাইনাস ৪৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সেই প্রসেসড মাংসের সাথে ভাল মাংস মিশিয়ে তা ছোট ছোট প্যাকেটজাত করা হতো। এরপর দালালদের হাত ধরে সেই মাংস পৌঁছে যায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে। পচা মাংসকেই প্রকিয়াকরণের মাধ্যমে বানানো হয় বিভিন্ন মুখরোচক খাবার। এরপর তা কখনও নামী ব্র্যান্ডের নকল মোড়কে মুড়িয়ে ফেলা হতো। কোনসময় অনামী কোন সংস্থার মোড়কেও তা প্যাকেটজাত করা হয়। এরপরই সেই প্রক্রিয়াজাত মাংসই একদিকে চলে যেতো কলকাতার বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, ছোট ছোট ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলিতে। অন্যদিকে তা চলে যেতো বাংলাদেশ, নেপালসহ বিভিন্ন দেশেও।

উল্লেখ্য গত ১৯ এপ্রিল মরা পশুর মাংস বাজারে সরবরাহের অভিযোগটি প্রথম আসে। ওই ঘটনায় দুই জনকে আটক করার পরই এই চক্রের হদিশ পায় পুলিশ। এরপর অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার কলকাতার নারকেলডাঙ্গা এলাকায় হিন্দুস্থান আইস এন্ড কোল্ড স্টোর (হিমঘর)-এর সন্ধান পায়। সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রায় বিশ টন ওজনের এক হাজারটি প্যাকেটজাত মাংস উদ্ধার করা হয়েছে-যার সবটাই মরা পশুর মাংস। মাংস উদ্ধারের পর ওই হিমঘরটিকে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওই মাংস পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে ল্যাবরেটরিতে।

বিডি প্রতিদিন