থামছে না জামায়াত অনুপ্রবেশকারী, আ.লীগের এমপি নদভীর বির্তকিত কর্মকান্ড!

86
নিজস্ব প্রতিবেদক: ফের বির্তকে জামায়াত ইসলামী থেকে অনুপ্রবেশকারী আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভী। তিনি চট্টগ্রাম ভিত্তিক দাতব্যমূলক এনজিও সংস্থা আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনেরও চেয়ারম্যান। এক সময় নদভীকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিলেন জামায়াত ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযম।
সম্প্রতি লোহাগাড়ার উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহবুব আলম কেজামায়াত-শিবিরের দোসর আখ্যা দিয়ে অপসারণের দাবিতে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের ব্যানারে আন্দোলন করছে তার অনুসারীরা। অন্যদিকে, উপজেলা আওয়ামী লীগ দাবি করছে এর সঙ্গে তাদের কোন সর্ম্পক নেই।
২০ এপ্রিল লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সংবাদ সম্মেলনে করে জানান, উপজেলা আওয়ামীলীগকে পাশ কাটিয়ে নদভী নিজ আত্মীয়-জনদের দলীয় বিভিন্ন কর্মকান্ডে ব্যবহার করছেন। তাছাড়া নদভী ও তার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণকে নানা ধরণের মামলা-হুমকি দিয়ে ভয়-ভীতি এবং জায়গা-জমি দখলের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ধরণের কর্মকান্ডে আগামী জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ থেকে নদভীকে মনোনয়ন না দিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণ।
তাছাড়া তার স্ত্রী রিজিয়া রেজা চৌধুরী চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে একাধিকবার জামায়াতের এমপি প্রার্থী এবং দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুমিনুল হক চৌধুরীর মেয়ে। রিজিয়া বর্তমানে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য। ছাত্র জীবনে রিজিয়া ইসলামী ছাত্রী সংস্থায় যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, সম্প্রতি লোহাগাড়ার পদুয়া ইউনিয়নে খাসজমি দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে নদভী ও লোহাগাড়ার ইউএনওর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ফলে নদভী ওই ইউএনও’র বাবা বিএনপির রাজনীতিদে জড়িত রয়েছে বলে সরকারের কাছে নালিশ করলে ১২ এপ্রিল ইউএনওকে প্রেষণে বদলির আদেশ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি সঠিক নয় প্রমাণ পেলে ১৮ এপ্রিল আরেকটি প্রজ্ঞাপনে ইউএনওর বদলির আদেশ বাতিল করে জনপ্রসাশন মন্ত্রণালয়।
এদিকে, ১৯ এপ্রিল নদভীর অনুসারী যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা উপজেলা চত্বরে একটি মানববন্ধন করে। এতে ইউএনও মাহবুব আলমকে জামায়াত-শিবিরের দোসর আখ্যা দিয়ে তাকে অপসারনের দাবি জানানো হয়।
২৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার বিকালে ফের নদভীর অনুসারীরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কস্থ উপজেলা পরিষদ গেট এলাকায় বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ইউএনও’র অপসারণ চাই অপসারণ চাই স্লোগান দিতে দিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা যায়। পরে ঘটনাস্থালে গিয়ে পুলিশ ও উপজেলা আ.লীগের নেতাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এ ব্যাপারে ইউএনও মাহবুব আলম তার ফেসবুকে লিখেন, ‘বুকে সততার সাহস নিয়েই বলি, আমার বিরুদ্ধে যদি একটাও অভিযোগ আমার সম্মুখে এসে কেউ প্রমাণ করতে পারে, লজ্জা নিয়ে নিজেই কর্মস্থল ছেড়ে যাব। এ বিষয় নিয়ে কাউকে অযথা কষ্ট কিম্বা সময় নষ্ট করতে হবে না।’
এদিকে, পদুয়া ইউনিয়নে খাসজমি দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী দিনমজুর নুরুল আলম ঘর ছাড়া। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, নদভীর লোকজন তাকে নানাভাবে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। বর্তমানে তিনি এলাকা ছাড়া।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে লোহাগাড়ায় জামায়েত ও বিএনপির বিরুদ্ধে নাশকতা মামলায় স্থানীয় আওয়ামীলীগ ও যুবলীগক নেতা কর্মীসহ মোট ১৬ জনকে পুলিশ দিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে যাদের জেল খাটায় নদভী। তাদের অধিকাংশই আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী।
লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী এ প্রতিবেদককে বলেন, উনার শশুর মমিনুল হক চৌধুরী জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য। উনি নিজেও একজন জামায়াতের লোক। যদিও জামায়াতের কোনো পদবী তার নেই। তবে জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে।
তার সমস্ত কর্মকান্ড আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী। তিনি কিভাবে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন পান, তার স্ত্রী কিভাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হন-এগুলো আমার বুঝে আসে না। এসব বলতেও আমাদের লজ্জা লাগে। তৃণমূল পর্যায়ে কোনো আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই।
লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন হিরু বলেন, উনি যে একজন জামায়াতের লোক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একজন জামায়াত ঘরনার লোক কিভাবে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশান পেয়েছেন তা আমার বোধগম্য নয়। উনি সংসদ সদস্য হওয়ার পর থেকে আমাদের স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। জেলা পর্যায়ে একাধিকবার বসার চেষ্টা করলেও তিনি বসেন নি। এখন পর্যন্ত তার উদ্যোগে কোনো সভা সমাবেশ হয়নি। আমরা যখন কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের বিষয়ে ওনাকে বলি তিনি কোনো কথা বলেন না।
হিরু বলেন, নদভী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি আওয়ামী লীগকে এড়িয়ে চলেন। যে কেউ আসলে দেখতে পাবে তৃণমূল পর্যায়ে কারো সমর্থন তার প্রতি নেই। তিনি বরাবরই আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী কথা বলেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে কটাক্ক করেন। তার নিজস্ব কিছু লোক আছে। তিনি তাদের দিয়ে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন। আমাদের ইউএনওকে অপসারণের দাবিতেও তার নিজস্ব ব্যক্তিবর্গ দিয়ে মিছিল করিয়েছেন। অনেক বয়স্ক যুবকদের দিযে ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিল করিয়েছেন।
তিনি যে একজন জামায়াতের লোক সেটি স্থানীয় পর্যায়ে এসে জিজ্ঞেস করলে যে কেউ বলবে। তিনি এখন আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী রয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে নেড়ি কুত্তার সাথে তুলনা করেন। তিনি আমাদের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তার স্ত্রীও একজন জামায়াত পরিবারের সদস্য। তার শশুর জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য।
জানতে চাইলে এ প্রতিবেদককে এমপি আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভী বলেন, আমি এসব বিষয়ে কিছু বলবো না। এসব পুরান কথা। আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে চাই না। আপনাদের কাছে কোনো কিছু জানার থাকলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেন, এনএসআই, ডিজিএফআইকে জিজ্ঞেস করেন।
এদিকে, প্রতিবেদকের নিকট ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের একটি সুভ্যেনিয়র (ক্রোড়পত্র) হাতে এসেছে যেখানে নদভীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের আমীর কাজী হোসাইন আহমদ, পাকিস্তানের জামায়াত নেতা আবদুল গাফফার, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামের সাবেক আমীর আমীর গোলাম আজম ও মতিউর রহমানসহ জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নদভীর একান্ত সাক্ষাতের ছবি রয়েছে। সেখানে জামায়াতে ইসলামের সাবেক আমীর গোলাম আজম নদভীকে একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিলেন জামায়াত ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযম। গোলাম আজম নদভীকে একজন বিজ্ঞ, জ্ঞানী ও উদিয়মান যুবক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘শেখ আবু রেজা নদভী। তিনি আমার পরিচিত। আমি জানি, তিনি একজন জ্ঞানী, বিজ্ঞ ও উদিয়মান যুবক। বিশ্বে বিশুদ্ধ আক্বিদায় বিশ্বাসী আলেম সমাজের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট পরিচয় রয়েছে। আমি তার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি যে, মহান আল্লাহ যেন তাকে আরো বেশি ইসলামের খেদমত করার সামর্থ দেন এবং তার ইহ-পরকালীন কল্যাণ কামনা করছি। প্রফেসর গোলাম আজম, আমীর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ।’
জানা যায়, এ সুভ্যেনিয়রের ছবি-ডকুমেন্টগুলো আগের। যখন নদভী ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়। এ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নদভী মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফান্ড পেয়ে থাকে। মূলত জামায়াতে ইসলামীর পরিচয়ে তিনি এ দাতব্যমূলক এনজিও সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছিলেন।