“পুরান ঢাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের কারখানা,গুদাম ও দোকান সরিয়ে নেয়া হোক”

77

নিমতলী ট্র্যাজেডির ৮ বছর পার হলেও পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে কারখানা,গুদাম ও দোকান এখনো সরেনি। বরং অলিতে-গলিতে গড়ে উঠছে রাসায়নিক পদার্থের কারখানা, গুদাম ও দোকানসহ প্লাস্টিক,পলিথিন ও জুতার কারখানা। নিমতলীসহ পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় জনসাধারণ অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের সাথে আতঙ্কে বসবাস করছে। এসব কারখানা, গুদাম ও দোকানে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট বড় দূর্ঘটনা যেখানে রাসায়নিক পদার্থের অব্যবস্থাপনায় বা সামান্য ত্রুটিতে ঘটে যেতে পারে নিমতলী ট্র্যাজেডির মতো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ।

তাই অবিলম্বে এসকল জায়গা থেকে অন্যত্র রাসায়নিক পদার্থের কারখানা, গুদাম ও দোকান সরিয়ে নিতে হবে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম (নাসফ)-সহ ১৬টি সংগঠনের উদ্যোগে আজ ০৩ জুন ২০১৮, রবিবার,
সকাল ১১.০০টায়, পুরান ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডির ঘটনাস্থল সংলগ্ন স্মৃতিস্থম্ভের পাশে, “পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক পদার্থের দোকান ও কারখানা সরিয়ে নেয়া হোক”-দাবীতে মানববন্ধনে বক্তারা উক্ত অভিমত ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য মানববন্ধনের শুরুতে নিমতলী ট্র্যাজেডির স্মরণে গড়ে তোলা স্মৃতিস্থম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পন করা হয় এবং শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয় । পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান-এর সভাপতিত্বে উক্ত
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন পবা’র সাধারণ সম্পাদক প্রকৌ. মো. আবদুস সোবহান, নাসফ-এর সাধারণ সম্পাদক মো. তৈয়ব আলী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী আবদুল আউয়াল, পুরান ঢাকা নাগরিক উদ্যোগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন, নাসফ-এর সহ-সম্পাদক মো. সেলিম, ক্যামেলিয়া চৌধুরী, ওহিদুর রহমান, সুবন্ধন সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, বানিপা’র সভাপতি প্রকৌ. মো. আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ যুব সমিতির মো. আকতার হোসেন, নবাব কাটারা সমাজ কল্যাণ সংগঠন এর সভাপতি হাজী মো.শহীদ মিয়া, মার্শাল আর্ট ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান আতিক মোর্শেদ, বাংলাদেশ সাইক্লিং ও হাঁটা জোট-এর সদস্য মো. নিশু সাদেক প্রমুখ ।

বক্তারা বলেন, ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে একটি ভবনের নিচতলার রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদামে আগুন লেগে মুহূর্তেই তা বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভয়াবহ এ অগ্নিকান্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে । রাসায়নিক কারখানা, গুদাম, দোকানে আগুন নিভানোর নিজস্ব কোন ব্যবস্থা নেই । প্রয়োজনীয় রাস্তার অভাবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ীগুলো দুর্ঘটনাস্থলে পৌছাতে পারে না। অনেক সময় অগ্নিকান্ডস্থলের কাছে জলাধার না থাকায় পানির অভাবে ফায়ার
সার্ভিসকে বেগ পেতে হয় । জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, সিটি করপোরেশন -এর উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতা এবং ভবনের মালিক ও রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়া ও অসচেতনার কারণে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকান্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটছে ।

দুর্ঘটনার পর পর সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ ও পদক্ষেপের কথা বলা হলেও বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বৈধ ও অবৈধ কারখানাগুলো সরাতে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও গত ছয় বছরে নিমতলীর আশেপাশের এলাকা এবং পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, কারখানা, দোকানগুলো সরিয়ে নেয়ার বাস্তসম্মত দৃশ্যমান কোন কার্যত্রম পরিলক্ষিত হয়নি। বরং
অলিতে-গলিতে গড়ে উঠছে রাসায়নিকের গুদাম, কারখানা ও দোকান এবং প্লাস্টিক ও পলিথিন কারখানা। নিমতলী এলাকায় রাসায়নিকের পুরাতন গুদামের সংখ্যা কমে এলেও আবার নতুন গুদাম গড়ে উঠেছে, রয়েছে প্লাস্টিকের অনেক কারখানা। নিমতলী এখনো একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ।

বক্তারা আরো বলেন,ঢাকা মহানগরীতে এক হাজারেরও বেশী কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে আট শত পঞ্চাশেরও বেশী অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশনের ছাড়পত্র বা লাইসেন্স গ্রহণের বিধান রয়েছে । পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম পরিচালনার কোন সুযোগ নেই ।

আবাসিক এলাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, শিল্পকারখানা ও দোকান সরিয়ে নেয়া না হলে নিমতলীর মতো আবারও যেকোন সময় বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। পুরান ঢাকায় বিদ্যমান বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, শিল্পকারখানা ও দোকানগুলো ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার জনজীবন, জননিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই জরুরীভিত্তিতে পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, কারখানা ও
দোকান সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন ।

করণীয়ঃ
-ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, কারখানা ও দোকান সরিয়ে নেয়া ।

-বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, কারখানা ও দোকানের জন্য সরকার কর্তৃক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের ব্যবস্থাসহ একটি পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলা ।

-পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক আবাসিক এলাকায় পরিচালিত কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম- এর বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ।

-কেমিক্যাল কারখানা, গুদাম পরিচালনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন কর্তৃক সংশ্লিষ্ট আইন মোতাবেক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ।

-পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর সব এলাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা, গুদাম সরাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা।
-নিমতলী অগ্নিকান্ডে নিহতদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা ।
-প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে সংগৃহীত অর্থ ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে সুষ্ঠু বন্টনের ব্যবস্থা করা ।