শাহীন হত্যা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টায় চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ

108

জামাল উদ্দিন স্বপন, কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থেকে শ্বশুরবাড়ি চৌদ্দগ্রামে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কর্তৃক জামাতা শাহীনকে (২৪) গলা কেটে, মাথায়, দু‘পায়ে ছুরিকাঘাত এবং শরীরের বিভিন্নস্থানে জখম করে নৃশংসভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনার মামলাটিকে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ কর্তৃক ধামা-চাপা দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগ করেছেন শাহীন হত্যা মামলার বাদি তার মা মনকির বেগম। শাহীনকে হত্যার ঘটনায় ময়না তদন্তের রিপোর্টে নরহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর শাহীনের মা মনকির বেগম গত ১৪ মে কুমিল্লার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে পুনরায় শাহীনকে হত্যার অভিযোগে শাহীনের শ্বশুর নুরুল আমিন, স্ত্রী শাহেনা আক্তার, শ্যালক বাবলু মিয়া, আলমগীর, শ্বাশুড়ী সাজেদা বেগমসহ অজ্ঞাতনামা ৬/৭জনকে আসামী করে সি আর মামলা নং ২৭০/২১৮ দায়ের করলে বিজ্ঞ আদালত চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশকে মামলাটিকে এফ আই আর হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল ফয়সল উক্ত ঘটনায় শাহীনের স্ত্রীর দায়ের করা সড়ক দুর্ঘটনার চৌদ্দগ্রাম থানার মামলা নং ২৯, তারিখ-২২/০২/২০১৮ ইং, যাহার জি আর নং ৬৩/১৮ তদন্তাধীন থাকার কথা বলে একই ঘটনার বিষয়ে বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক এফ আই আর হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ সংক্রান্তে বিজ্ঞ আদালত হতে পুনরায় নির্দেশনা প্রদানের আবেদন করেন।
এর আগে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে শাহীনের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনা জনিত বলে প্রতিয়মান হলেও মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে লাশ ময়না তদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ময়না তদন্ত রিপোর্টে শাহীনের মৃত্যুর ঘটনাটিকে নরহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শাহীনের মা মনকির বেগম আদালতে মামলার সাথে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট জমা দেয়ার পর বিজ্ঞ আদালত চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশকে মামলাটিকে এফ আই আর হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ মামলাটিকে এফ আই আর হিসেবে না নিয়ে শাহীনের স্ত্রীর দায়ের করা সড়ক দুর্ঘটনার মামলাটি তদন্তাধীন থাকার কথা বলে বিজ্ঞ আদালত হতে পুনরায় নির্দেশনা প্রদানের আবেদন করেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর সড়ক দুর্ঘটনার মামলার তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন করেন শাহীনের মা মামলার বাদি মনকির বেগম।

গত গত প্রায় নয় মাস পূর্বে নাঙ্গলকোট উপজেলার বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের আঙ্গলখোঁড় গ্রামের মৃত মফিজুর রহমানের ছেলে রাজমিস্ত্রি শাহীন পাশ্ববর্তী চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নের সুজাতপুর গ্রামের নুরুল আমিনের মেয়ে শাহেনা আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে শাহীনের বিরোধ চলে আসছিল। গত ২১ ফেব্রুয়ারী শাহীনকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মোবাইল ফোনে চৌদ্দগ্রামে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার পর ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামের সুজাতপুরে শাহীনের লাশ ফেলে রাখে। পরে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ খবর পেয়ে শাহীনের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। শাহীন হত্যাকান্ডের পর তার স্ত্রী শাহেনা আক্তার অজ্ঞাতনামা গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে এজহার দায়ের করলে এ সংক্রান্তে চৌদ্দগ্রাম থানায় মামলা নং-২৯, তারিখ-২২-০২-২০১৮ ইং মুলে ধারা ২৭৯/৩০৪-খ দন্ডবিধি মামলা রুজু হয়। পরে শাহীনের মা মনকির বেগম শাহীনকে হত্যার অভিযোগে কুমিল্লার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ৫নং আমলী আদালতে সি আর মামলা নং ১১১/২০১৮ (১৪), তারিখ-২৬-০২-২০১৮ ইং মূলে ৩০২/৩৪ দন্ড বিধি ধারায় শাহীনের শ্বশুর নুরুল আমিন, স্ত্রী শাহেনা আক্তার, শ্যালক বাবলু মিয়া, আলমগীর, শ্বাশুড়ি সাজেদা বেগমসহ অজ্ঞাতনামা ৬/৭জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন।

আদালতে মামলার প্রেক্ষিতে চৌদ্দগ্রাম থানার এস আই ( উপ-পরিদর্শক) সাইফুল ইসলাম গত ৪ মার্চ বিজ্ঞ আদালতে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, শাহীন অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় রাস্তার ডিভাইডারের ধারালো পাকা অংশে পড়ে গলায় কাটা ছেড়া জখম, মাথার পিছনে রক্তাক্ত জখম, বাম কানে রক্তাক্ত জখম, গলার নিচের অংশে ফাটা রক্তাক্ত জখম, বাম কাধ থেতলানো জখম, ডান হাতে ছেছড়ানো জখম, পেট, পিঠ ছেছড়ানো জখম, নিতম্বে ছেছড়ানো জখম, দুই পাড়ের হাঁটুর নিচ হতে গোড়ালী পর্যন্ত চামড়া ছেড়া থেতলানো জখম, পায়খানা প্রশ্রাবের রাস্তা স্বাভাবিক আছে মর্মে উল্লেখ করেন। এছাড়া তিনি শাহীনের মৃত্যুর ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনা জনিত বলে প্রতিয়মান হলেও মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য লাশ ময়না তদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে শাহীন অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় রাস্তার ডিভাইডারের ধারালো পাকা অংশে পড়ে গলায় কাটা ছেড়া জখম হয় বলে উল্লেখ করা হয়। এখানে রাস্তার ডিভাইডারের ধারালো পাকা অংশে পড়ে গলায় কাটা ছেড়া জখম হওয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রাস্তার ডিভাইডারের ধারালো পাকা অংশে পড়ে গলা কাটা কিভাবে সম্ভব?

গত ১ এফ্রিল কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডাঃ মোহাম্মদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত শাহীনের ময়না তদন্তের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে ১। শাহীনের গলার সম্মুখভাগে বুক পর্যন্ত বিস্তৃত ছয় ইঞ্চি/ দুই ইঞ্চি কাটা চিহৃ রয়েছে ২। মাথার পিছনের খুলিতে দুই ইঞ্চি/ এক ইঞ্চি জখম রয়েছে ৩। কপালের বাম পার্শ্বে দেড় ইঞ্চি/ এক ইঞ্চি জখম রয়েছে ৪। বাম হাতে জখম এবং ভাঙ্গা রয়েছে ৫। দু‘পায়ের হাঁটুর নিচে জখম এবং উভয় হাঁটুতে ভাঙ্গা পাওয়া গেছে ৬। ধারালো কোন কিছু দিয়ে বাম কান কাটা ৭। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছোট-বড় বিভিন্ন ধরণের থেতলানো ক্ষত পাওয়া গেছে।

ডাঃ মোহাম্মদ ওমর ফারুক ময়না তদন্তের রিপোর্টের মতামতে উল্লেখ করেন, ময়না তদন্তের অর্থ বিবেচনা করে এবং আন্তরয়ন্ত্রের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে মৃত্যু সম্পর্কে মতামত হচ্ছে, রক্ত ক্ষরণজনিত কারণে এবং ময়না তদন্তের রিপোর্টে উল্লেখিত মৃত্যুর পূর্বে আঘাতের কারণে মৃত্যু হয়েছে এবং প্রকৃত অর্থে এটি নর হত্যা জনিত অপরাধের শামিল।

ময়নাতদন্তের রিপোর্টে শাহীনের মৃত্যুর বিষয়টিকে নরহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও শাহীনের স্ত্রীর দায়ের করা সড়ক দুর্ঘটনা মামলায় পুলিশের তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।