মেঘ দেখলেই ভয় রোহিঙ্গাদের

110

মেঘ দেখলেই ভয় পায় বালুখালী ও কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গারা । এরই মধ্যে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে আক্রান্ত হয়েছে বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পটি । কুতুপালং ও বালুখালীতেই প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে কখন বৃষ্টি আসবে । এর মধ্যে কয়েক দফা বৃষ্টি ও ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বাড়িঘর । ঘরের ভিতরে দূষিত পানিতে নানা রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাবও দেখা গেছে । বিশেষ করে কুতুপালং ও বালুখালীর ক্যাম্পগুলোর ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা রোগ দেখা দিয়েছে । নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছোট বাচ্চাদের দেখা গেছে মেডিকেল ক্যাম্পগুলোতে । তবে অধিকাংশ টিউবওয়েল বিকল হয়ে যাওয়ায় সুপেয় পানিও পাচ্ছে না রোহিঙ্গারা । গতকাল কুতুপালং ও বালুখালীর কয়েকটি ক্যাম্প সরেজমিন ঘুরে এ চিত্র লক্ষ্য করা গেছে ।

সূত্রমতে, কক্সবাজারের বালুখালী ও কুতুপালংয়ের বিস্তীর্ণ বনভূমি এবং টেকনাফের লেদা ও মোছনী ক্যাম্পে নতুন-পুরনো প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে । এর মধ্যে এক লাখ চলতি বর্ষা মৌসুমে ভূমিধস ও বন্যার মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে ইউএনএইচসিআর । গত বছর ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া রোহিঙ্গা ঢল কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং, বালুখালীর ঘন বন উজাড় করে পাহাড়ে যত্রতত্র নির্মাণ করতে থাকে হাজার হাজার ঝুপড়ি ঘর । ঝুপড়িগুলো পলিথিন, ত্রিপল ও বাঁশ দিয়ে তৈরি । বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘শরণার্থী’ ৫ লাখ ৬৯ হাজার মানুষ কুতুপালং ও বালুখালীতে বসবাস করছে । তার মধ্যে কমপক্ষে এক লাখ রোহিঙ্গা পাহাড়ধস ও বন্যার মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে ।

মিয়ানমানের বুসিদং থেকে আসা ওসমান গনি নামে একজন রোহিঙ্গা পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বালুখালী-২ ক্যাম্পের ই-১৪ ব্লকে । গতকাল বিকালে কথা হয় তার সঙ্গে । তিনি জানান, চাল-ডালসহ সামান্য খাবার পেলেও তারা ঘরে থাকতে পারছেন না । গত কয়েক দিন ধরে বৃষ্টিতে তাদের ঘরে হাঁটু সমান পানি । তার দুই বাচ্চার ডায়রিয়া হয়েছে । রান্নার চুলাও জ্বলে না ঠিকমতো । তাছাড়া অনেকদূর থেকে কাঠ কিনে আনতে হয় । একই এলাকা থেকে আসা ইব্রাহিম নামে আরেক রোহিঙ্গা জানালেন, বর্ষার পানিতে তাদের ল্যাট্রিন ভরে গেছে । এখন তাদের পরিবারের সদস্যরা ঠিকমতো ল্যাট্রিনেও যেতে পারেন না । মো. সেলিম নামে এক রোহিঙ্গা যুবক বললেন, বালুখালীর ময়নারগোনা ক্যাম্পে অধিকাংশ টিউবওয়েলই এখন অকেজো হয়ে পড়েছে । যার কারণে এ ক্যাম্পে সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে । যে কয়টি সচল আছে সেখানে লম্বা লাইন । তাই অনেকেই সুপেয় পানির পরিবর্তে বর্ষার পানি ফুটিয়ে পান করছে ।

স্থানীয়রা জানান, কুতুপালং ও বালুখালীতে অর্ধশত পাহাড় ন্যাড়া করে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা । এখন বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে । এখানে থাকা প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গার জীবন চরম হুমকিতে রয়েছে । কারণ, প্রবল বর্ষা শুরু হলে যে কোনো সময় পাহাড়ে ঢল নামতে পারে । এতে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে । এদিকে ঝড়বৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ঢল নামছে মেডিকেল ক্যাম্পগুলোতে । রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় প্রায় শতাধিক মেডিকেল ক্যাম্প কাজ করছে । বালুখালীতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ড্যাবের পরিচালনায় অস্থায়ী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, মা, শিশু স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে দেখা গেছে নারী ও শিশুদের দীর্ঘ লাইন । সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, রোগীদের অধিকাংশই নারী ও শিশু । বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় সর্দি, জ্বর, ডায়রিয়া ও আমাশয়ের রোগীর সংখ্যাই বেশি ।

এ প্রসঙ্গে ড্যাবের মহাসচিব ও ওই মেডিকেল ক্যাম্পের তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় সর্দি, কাশি ও চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে । আমরা তাদের ফ্রি চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি । নিয়মিত চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সরবরাহ করছি । ল্যাবের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছি । গর্ভবতী নারীদের স্বাস্ব্যসেবার পাশাপাশি রোহিঙ্গা নারীদের পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণেও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে ।

এদিকে টানা ভারি বর্ষণে উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের ৫ শতাধিক ঝুপড়ি ঘর ধসে পড়েছে । পরিবারগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে চরম মানবেতর দিনযাপন করছে । কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ নুর জানান, প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া ও ভারি বৃষ্টিপাত বইতে শুরু করে । রাত যত গভীর হয়েছে ততই বেড়েছে বৃষ্টি ও বাতাসের গতিবেগ । ভোর রাতের দিকে বৃষ্টির মাত্রা বাড়ায় অসংখ্য ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে । তার মতে, কুতুপালং ক্যাম্পে শতাধিক ঝুপড়ি ঘর ধসে পড়ে বেশকিছু পরিবার গৃহহীন অবস্থায় রয়েছে । বালুখালী ক্যাম্পের লালু মাঝি জানান, তার ক্যাম্প পাহাড় কেটে বসবাসের উপযোগী করে অধিকাংশ ঘর তৈরি করা হয়েছিল, যেগুলো ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ । এর আগে প্রশাসন কিছু পরিবার নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে গেলেও দুই শতাধিক পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থেকে যায় ।