অভিযানের পরও বদলায়নি মাদক ব্যবসায়ীদের স্বভাব

24

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের পরও বদলায়নি মাদক ব্যবসায়ীদের স্বভাব। বন্ধ হয়নি মাদকের চালান। অভিযানের মধ্যেই ভিন্ন কৌশলে মাদক পাচার করছেন ব্যবসায়ীরা। অভিজাত হোটেল ও ক্লাবে অবৈধভাবে মাদকের ব্যবসাও চলার খবর দিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দারা। আবার কখনও বাসে বিশেষভাবে তৈরি চ্যাম্বারে, কখনও ডাবে, কখনও ফলের গাড়িতে, কখনও বা ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর আড়ালে বাহক কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় ইয়াবা আসার খবর দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এবার ফেসওয়াশ-ক্রিমের আড়ালে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ইয়াবার বড় চালান আসার খবর দিলো র‌্যাব।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর মতিঝিল দিলকুশা এলাকার সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ভাটিকা ও প্যারাসুটের আড়ালে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা নেয়ার সময় র‌্যাব-১০ এর হাতে আটক হন ইয়াবার চার ডিলার আরিফ, ফোরকান, রুবেল ও আবু নাইম।

সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক (কমান্ডিং অফিসার) এডিশনাল ডিআইজি কাইয়ুমুজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ভাটিকা ও প্যারাসুট কসমেটিক্সের কৌটার মধ্যে বিশেষ কৌশল খাটিয়ে ইয়াবাগুলো কুরিয়ার করা হয়। প্রত্যেক কৌটায় ১ হাজার পিস করে ইয়াবা ছিল। যা বাইরে থেকে সহজে কেউ বুঝতে পারবে না যে কৌটাগুলোতে ইয়াবা আছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব সদস্যরা আগে থেকেই অবস্থান নেয়। পরে চার যুবক পার্সেল চারটি রিসিভ করতেই র‌্যাব সদস্যরা আটক করে তাদের।

এক প্রশ্নের জবাবে সিও বলেন, কুরিয়ার সার্ভিসের মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা যাতে আরও সতর্ক থাকেন মালামাল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে। তাদের কেউ মাদকের চালান আনা নেয়ার ক্ষেত্রে জড়িত থাকার বিষয়ে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।

র‌্যাব-১০ এর সিও বলেন, আটক হওয়া চারজনই ইয়াবা ডিলার। তারা ঢাকায় এসে কেউ মিরপুরে, কেউ বাড্ডায় আবার কেউ উত্তরায় ইয়াবার ব্যবসা করে। এর আগে থেকে তারা চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে ইয়াবা নিয়ে এসে ঢাকায় বিক্রি করেছে।

র‌্যাব-১০ এর অপারেশন কমান্ডার অ্যাডিশনাল এসপি মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, চট্টগ্রাম থেকে রাকিব ও শাওন নামে দুজন ছদ্মনামে কুরিয়ারে ইয়াবাগুলো পার্সেল করেন। আসলে তাদের নাম শাওন ইসলাম ও ইমরান। তাদেরকেও আমরা আটকের চেষ্টা করছি। আটকদের নিয়ে ঢাকার আর কোথায় কে আছে তা খুঁজে বের করা হবে।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর এ্যালিফ্যান্ট রোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে টেকনাফ এলাকার অন্যতম মাদক ব্যবসায়ী জহির আহমেদ ওরফে মৌলভী জহিরসহ ছয়জনকে আটক করে র‌্যাব-২। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২ লাখ ৭ হাজার ১০০ পিস ইয়াবা এবং মাদক বিক্রির ৭ কোটি ২৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা উদ্ধার করে। আটকরা টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর আড়ালে বাহক কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় ইয়াবার চালান আনতেন।

গত ২৬ জুলাই মোহাম্মদপুর থানাধীন জেনেভা ক্যাম্প এলাকা হতে সাড়ে ৪শ’ পিস ইয়াবা ও মোটরসাইকেলসহ জন আল আমিন ওরফে জ্যাকি (৩০) নামে এক মাদকের বাহককে আটক করা র‌্যাব। জ্যাকি মোটরসাইকেলে বিশেষ চ্যাম্বার তৈরির পর ওই ইয়াবা বহন করছিল।

১৬ জুলাই রাজধানীর বনানী হতে অভিনব কায়দায় পেটের ভেতরে ১৮ শ’ পিস ইয়াবা পাচারকালে আসাদ (২৪), শুকুর আলী (২১) ও শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিক (২১) নামে তিনজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এছাড়া কাভার্ডভ্যানে, বিলাশবহুল বাসে, কুরিয়ার সার্ভিসে ইয়াবা পাচারকালে ১৫টি ঘটনায় ২০ জনকে হাতেনাতে আটক করে র‌্যাব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক ব্যবসায়ীদের কৌশল বদলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কৌশলী হতে হবে। তাদের মাদকবিরোধী অভিযান সফল করতে হলে জনসম্পৃক্ততা জরুরি।

পুলিশ সদর দফতর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অভিযানে ৪২ হাজার ৮০৫ জন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী গ্রেফতার হয়েছে। মামলা হয়েছে ৩৩ হাজারের ওপরে।

অন্যদিকে র‌্যাব সদর দফতরের তথ্যমতে, গত ৩০ এপ্রিল থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে সারাদেশে র‌্যাব ২ হাজার ৫৮০টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এরমধ্যে মাদক মামলায় গ্রেফতার করা হয় ১০ হাজার ৪৩ জনকে। হেরোইন, ইয়াবা ট্যাবলেট, ফেন্সিডিল, গাঁজা, বিদেশি ও দেশি মদসহ মোট ১৮৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সমমূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করে। ১১৫৭ জনকে মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কারাদণ্ড দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানকালে ৬৫ জন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।

এর আগে এক অনুষ্ঠানে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পরও মাদক আসছে। আমরা মাদক ধরতে অভিযান পরিচালনা করছি। মাদক পরিবহনে দূরপাল্লার বাস জব্দ করা হয়েছে। আমাদের এনফোর্সমেন্ট মাদকের সাপ্লাই ডিটেকশনে কাজ করছে। কিন্তু যদি সাপ্লাই-ডিমান্ড বন্ধ করা না যায় তবে মাদক নির্মূল সম্ভব না। এজন্য মাদকবিরোধী প্রচারণার পাশাপাশি কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ঢাকা মেট্রোর উপ-পরিচালক মকুল জ্যোতি চাকমা জানান, অভিযানের কারণে মাদক বিক্রি কমেছে। তবে বন্ধ হয়নি। আগের মতো আর প্রকাশ্যে নেই। কৌশল পাল্টে চলছে মাদক কেনাবেচা। হোম ডেলিভারি, কুরিয়ারে ডেলিভারি হচ্ছে।

এ ব্যাপারে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মো. সহিদুল ইসলাম বলেছেন, রাজধানীর অনেক ক্লাবের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে মাদক আমদানি, শুল্ক ফাঁকি ও চোরাচালানের মাধ্যমে মাদক এনে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে কাজ চলছে। প্রমাণের ভিত্তিতে সেসব ক্লাবের অভিযান পরিচালনা করবে শুল্ক গোয়েন্দা।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, মাদককে নির্মূল করতেই হবে। নইলে আমরা পথ হারাবো। এই যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে। এই যুদ্ধ সেদিন থামবে, যেদিন আমরা দেখবো সেই বাংলাদেশকে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি। যেখানেই অবৈধ ব্যবসা সেখানেই অবৈধ অর্থ, অবৈধ অস্ত্র। সুতরাং মাদক আগে নির্মূল জরুরি আমরা যেমন করে জঙ্গিবাদ দমন করেছি তেমনিভাবে মাদকও দমন করা হবে।